অনুসন্ধান

গতবছর মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ প্রবেশের ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ ও দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্তের পর, অনেকেই অভিমত প্রকাশ করেন যে এমন সাহসী ও উদার পদক্ষেপের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতা হিসেবে, শেখ হাসিনা ওয়াজেদের শান্তিতে নোবেল প্রাপ্য। এই নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা ও সমর্থক বিভিন্ন সম্মেলন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করে, যা উঠে আসে বিভিন্ন সংবাদে।

অপরদিকে একটি পক্ষ এই সংবাদগুলোকে কিছুটা ব্যাঙ্গ করে পাল্টা সংবাদ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে ‘বাংলা ইনসাইডার’ নামক একটি নিউজ পোর্টাল। পোর্টালটিতে ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার: শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে বলা হয়, অক্সফোর্ড, কলাম্বিয়া, হার্ভার্ড এবং অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন অধ্যক্ষরা সাম্প্রতিক সময় রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের অনন্য ভূমিকার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ঐ রিপোর্টে উল্লেখিত ৭ জন অধ্যক্ষের কেউই শেখ হাসিনার নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে কোন মন্তব্য তো দূরের কথা, অনেক খুঁজেও রোহিঙ্গা ইস্যুতেই তাদের কোন অভিমত পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র নিউজ পোর্টালে হিট বাড়ানোর লোভে, সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে নিউজ পোর্টালটি।

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭ তে “নোবেল শান্তির সংক্ষিপ্ত তালিকায় শেখ হাসিনা” শিরোনামে ভিত্তিহীন তথ্যের উপর সংবাদ প্রকাশ করে।

সেই সময়ের চলমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর এমন দৃষ্টান্তমূলক ও সাহসী পদক্ষেপের জন্য তিনি বাংলাদেশে জনগণ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে সমাদৃত হোন। তাই স্বাভাবিকভাবেই, এই সংবাদটিও অনেকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে। ফলে, সংবাদটি শুধুমাত্র ফেসবুকেই ২৭,৯০০ বার শেয়ার ও লাইক পায়। এমনকি আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলককেও এমন মিথ্যাচারের শিকার হয়ে ফেসবুকে সংবাদটি শেয়ার করতে দেখা যায়।

এমন সংবাদ প্রকাশ করে, একদিকে এমন উদার একটি কাজের পরও যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিদ্রূপের পাত্র হিসেবে পরিণত করা হয় এবং অপরদিকে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের আবেগ ও বুদ্ধিমত্তাকে হেয় করে বাংলা ইনসাইডার

বাংলা ইনসাইডারের সাথে পাল্লা দিয়ে একই ধরণের বানোয়াট খবর প্রকাশ করে ‘বিডি মর্নিং’ নামক আরেকটি নিউজ পোর্টাল।

এমন নির্লজ্জভাবে কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম জুড়ে দিয়ে কেউ খবর করতে পারবে সেটি স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই বিশ্বাস করতে পারে নি। দায়িত্বহীন ও সত্যতা যাচাই ছাড়া বাংলাদেশের নিউজ পোর্টালগুলো সংবাদ প্রকাশ করলেও সম্পূর্ণ কাল্পনিক তথ্যের উপর এমন বানোয়াট সংবাদ প্রকাশের নজির বাংলা ইনসাইডারের পূর্বে পাওয়া যায় না।

একারণে দেখা যায়, অনেক সংবাদ মাধ্যমও বাংলা ইনসাইডারকে সূত্র দেখিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে। যদিও এদের কেউ কেউ পরবর্তীতে বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রকাশিত সংবাদ মুছে ফেলে কিন্তু সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত বাংলা ইনসাইডার তাদের পত্রিকায় সংবাদ রেখে দেয় নির্লজ্জভাবে।

শুধুমাত্র একটি সংবাদ করে বাংলাদেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে নিউজ পোর্টালটি ক্ষান্ত হয় নি। নিউজ পোর্টালে হিটের আশায় এরপরেও শেখ হাসিনাকে নিয়ে তৈরি করা হয় একাধিক বানোয়াট সংবাদ। যার তালিকা এই প্রবন্ধের নিচে দেওয়া আছে।

মিথ্যাচারের শিকার বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ

দশম জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনে এক সম্পূরক প্রশ্নে জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম বাংলা ইনসাইডারে ১২ ও ২০ নভেম্বর, ২০১৭ তারিখে ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস’ নামক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রকাশিত খবরের প্রসঙ্গ তোলেন। বাংলা ইনসাইডারের ঐ রিপোর্ট দুটিতে বলা হয়, এই নামে প্রতিষ্ঠানটি এক গবেষণায় শেখ হাসিনাকে বিশ্বের চতুর্থ কর্মঠ ও তৃতীয় সৎ সরকারপ্রধান হিসেবে খেতাব দিয়েছে। অথচ এমন কোন গবেষণা তো দূরের কথা, ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস’ নামক কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

বাংলা ইনসাইডার, নিজেদের এই সংবাদগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট জানার পরেও, সংসদে তাদের সংবাদের উল্লেখ নির্লজ্জভাবে খবর আকারে প্রকাশ।

বাংলা ইনসাইডারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে প্রকাশিত বানোয়াট সংবাদের তালিকা

  • ০৬ সেপ্ট ২০১৭ – জাতিসংঘে দুটি পুরস্কার পাচ্ছেন শেখ হাসিনা (২০১৬ সালে ইউএন উইমেন এর পুরষ্কার পাওয়ার সংবাদ নকল করে করা)
  • ১১ সেপ্ট ২০১৭ – নোবেল শান্তি পুরস্কার: শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব (আসল ব্যক্তিদের কাল্পনিক মতামত তৈরি করে করা)
  • ১৭ সেপ্ট ২০১৭নোবেল শান্তির সংক্ষিপ্ত তালিকায় শেখ হাসিনা (কাল্পনিক তথ্যের উপর তৈরি করা)
  • ২০ সেপ্ট ২০১৭ – শেখ হাসিনা, মেরকেল নাকি…. (নোবেল প্রাপ্তির নিয়ে কাল্পনিক তথ্যের ভিত্তিতে করা রিপোর্ট)
  • ২৪ সেপ্ট ২০১৭ – বিশেষজ্ঞ মতামতে শেখ হাসিনা এগিয়ে (নোবেল প্রাপ্তির নিয়ে কাল্পনিক তথ্যের ভিত্তিতে করা রিপোর্ট)
  • ২৮ সেপ্ট ২০১৭ – জাতিসংঘের পছন্দ শেখ হাসিনা (জাতিসংঘের একাধিক কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে করা)
  • ০৩ অক্টো ২০১৭ – ওসলোতে শেখ হাসিনা ও মেরকেল চর্চা (নোবেল প্রাপ্তির নিয়ে কাল্পনিক তথ্যের ভিত্তিতে করা রিপোর্ট)
  • ২১ অক্টো ২০১৭ – জনপ্রিয় সরকার প্রধানদের শীর্ষ দশে শেখ হাসিনা (পূর্বের নাম ঘুরিয়ে ‘পলিটিক্স অ্যান্ড পিপলস’ নামক কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে করা)
  • ২১ অক্টো ২০১৭ – বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী নারী শাসক শেখ হাসিনা (গার্ডিয়ান পত্রিকার নাম ব্যবহার করে করা)
  • ১২ নভে ২০১৭ – শেখ হাসিনা: বিশ্বে চতুর্থ কর্মঠ সরকারপ্রধান (অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর নাম ব্যবহার করে করা)
  • ২০ নভে ২০১৭শেখ হাসিনা বিশ্বের ৩য় সৎ সরকার প্রধান (অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর নাম ব্যবহার করে করা)
  • ২৬ ডিসে ২০১৭ – শেখ হাসিনা ৭৭, বেগম জিয়া ২৩ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর নাম ব্যবহার করে করা)
  • ০৮ জানু ২০১৮ – শেখ হাসিনা: বিশ্ব মানবতায় চ্যাম্পিয়ন (অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ডেকিন ইউনিভার্সিটির নাম ব্যবহার করে করা)
  • ১৫ ফেব্রু ২০১৮ – সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বসেরা শেখ হাসিনা (অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর নাম ব্যবহার করে করা)
  • ২৭ ফেব্রু ২০১৮ – হার্ভার্ডে শেখ হাসিনা চর্চা (হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপকের নাম ব্যবহার করে করা, যারা এমন গবেষণার কথা সরাসরি অস্বিকার করেছে)
  • ৮ মার্চ ২০১৮ – শেখ হাসিনা: বিশ্বের সবচেয়ে মিতব্যয়ী সরকারপ্রধান (অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’-এর নাম ব্যবহার করে করা)

অধিক হিট পাওয়ার আশায়, এসব সংবাদের ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশিত করা হয় পোর্টালটিতে এবং এছাড়া তৈরি হচ্ছে ইউটিউব ভিডিও। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কিত করে ও সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে হাসির পাত্র বানিয়ে প্রকাশিত এসব নির্লজ্জ মিথ্যাচারের ফলে, একটি বেনামী অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যা অন্য প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ কপি-পেস্ট করে চলতো, তা রাতারাতি দেশের ১৫৭ তম ট্রাফিক সম্পন্ন ওয়েবসাইটে পরিণত হয়।

এই নিউজ পোর্টালের নেপথ্যে কারা?

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে শুরু করা নিউজ পোর্টালটি গত বছর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে চালু হয়। ওয়েবসাইটটিতে সম্পাদক হিসেবে  ‘সৈয়দ বোরহান কবীর’-এর নাম লেখা আছে। এছাড়াও পোর্টালটি ‘ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের অঙ্গসংস্থা হিসেবে সেখানে উল্লেখ আছে।

ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বোরহান কবির ও অন্যান্যদের পরিচয়।

ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত। পারিবারিকভাবেই পরিচালিত হয় এই প্রতিষ্ঠানটি।

শোচনীয় বিষয় হচ্ছে, সৈয়দ বোরহান কবীর বিটিভিতে প্রচারিত এককালের জনপ্রিয় অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠান, ‘পরিপ্রেক্ষিত’-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটির পরিবেশনায় ছিলো তারই প্রতিষ্ঠান ‘ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেড’। বাংলাদেশে সত্যতা যাচাই ও উদঘাটনের পথিকৃৎ হিসেবে অনুষ্ঠানটিকে ধরা হলেও আজ সেই একই প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির দ্বারা, সাংবাদিকতার নূন্যতম নৈতিকতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে,  বাংলা ইনসাইডারে প্রকাশিত হচ্ছে দায়িত্বজ্ঞানহীন বানোয়াট সংবাদ।

পাদটীকা

মন্তব্য

আমাদের ফেসবুকগ্রুপে আলোচনায় যুক্ত হোন।: www.facebook.com/groups/jaachai