অনুসন্ধান

মূল উৎপত্তি

“নোবেল শান্তির সংক্ষিপ্ত তালিকায় শেখ হাসিনা”-এমন শিরোনামে প্রথম সংবাদ প্রকাশ করে বাংলা ইনসাইডার নামক একটি বেনামি নিউজ পোর্টাল। কপি-পেস্ট করে প্রকাশিত রিপোর্টে পরিপূর্ণ এই নিউজ পোর্টালটি দাবী করে গত জুলাই মাসে উপদেষ্টা মূল্যায়নের ভিত্তিতে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের সংক্ষিপ্ত একটি তালিকা উপস্থাপিত হয়েছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির কাছে। যদিও এই তালিকা তাদের কাছে কিভাবে পৌঁছেছে সেই ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করা হয় নি।

এই রিপোর্টটি প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মী-সমর্থক এই খবরটি নিজেদের মাধ্যমগুলোতে প্রচার করে। শেখ হাসিনার কন্যা, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল-এর নামে পরিচালিত একটি বেনামি ফেইসবুক পেইজের উদ্ধৃতি দিয়ে খবরটি প্রকাশ করে আরটিভি অনলাইনসহ আরও বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টাল।

রিপোর্টটিতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, আমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন এর নেতা সুসান এন হারম্যান, ‘কোড পিঙ্ক’ এবং ‘গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ’ এর সহ প্রতিষ্ঠাতা মেডা বেঞ্জামিন, নরওয়ের শান্তি শিক্ষাবিদ জন গ্যালটাঙ্গে, ‘ওয়ান বিলিয়ন অ্যাক্ট অব পিস’, পোপ ফ্যান্সিসে প্রমুখের নাম এই তালিকায় রয়েছে।

এই রিপোর্টটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এমন একটি চাঞ্চল্যকর ‘তালিকা ফাঁসের’ খবর আন্তর্জাতিক কোন গণমাধ্যমে আসে নি বা এই সংবাদটি সমর্থন করে এমন কোন উৎস অনলাইনে কোথাও পাওয়া যায় নি।

কয়েক দিন আগেও নিউজ পোর্টালটি “নোবেল শান্তি পুরস্কার: শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব” শিরোনামে এমন আরেকটি ভিত্তিহীন খবর প্রকাশ করে। ঐ সংবাদটিও একইভাবেই সায়মা ওয়াজেদ পুতুল-এর নামে পরিচালিত বেনামি ফেইসবুক পেইজে শেয়ার করা হলে সেটির উদ্ধৃতি দিয়ে খবরটি আরটিভি অনলাইনসহ আরও বেশ ক’টি নিউজ পোর্টাল সংবাদটি হুবহু নকল করে প্রকাশ করে। অথচ ফেইসবুক পেইজটির বিবরণীতে লেখা আছে―

“This Is A Fan Page Of Saima Wazed”

এই গোষ্ঠীরই পরিচালিত এরকম তথাকথিত ফ্যান পেইজ রয়েছে শেখ হাসিনার নামেও। এসব পেইজের প্রত্যেকটি রয়েছে লক্ষাধিক ফলোয়ার। আর এই কারণেই অনেকেই কোনরূপ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব পেইজগুলোকে ‘অফিশিয়াল’ পেইজ বলে মনে করে। এমনকি সায়মা ওয়াজেদের পোস্টটি হুবহু কপি করে সংবাদ করা আরটিভি অনলাইনও তাদের রিপোর্টটিতে উল্লেখ করে―

“প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ফেসবুক থেকে এ তথ্য জানা গেছে।”

এখানে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, যদি এটি সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের অফিশিয়াল পেইজও হতো, তাহলেও এটিকে তথ্যসূত্র হিসেবে নেওয়া উচিৎ নয়। কেননা, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল পেশায় সাংবাদিক নন কিংবা কোন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিও নন। এছাড়াও এখানে এসব দাবীর কোনটিরই তথ্যসূত্র প্রদান করা হয় নি।

বিডি মর্নিং নামক একটি নিউজ পোর্টাল এই খবরটি প্রকাশের পর সেপ্টেম্বর ২১ তারিখেও “নোবেল শান্তি পুরস্কারে ৩ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা”-এমন আরেকটি সংবাদ প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়,

“নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১৭ সেরা তিন জনের তালিকা প্রকাশ করেছে নোবেল কমিটি। এ তালিকায় উঠে এসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম।”

শেখা হাসিনা ছাড়া, তালিকায় বাকি ২ জন হলো, চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও সিরিয়ার একটি মানবতাবাদী সংগঠণ হোয়াইট হেলমেট। রিপোর্টটিতে আরও বলা হয়―

“আজ সকালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য গঠিত উপদেষ্টা কমিটি ৩ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা চূড়ান্ত করেছে। যদিও প্রতিবছর, আগস্টে চূড়ান্ত বৈঠক হয়ে যায়, কিন্তু এবছর ১১ সেপ্টেম্বর নরওয়ের পার্লামেন্ট এর নির্বাচনের কারণে, উপদেষ্টা কমিটি গঠন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে।”

এই খবর প্রকাশের পর অন্যান্য নিউজ পোর্টালগুলো এটিও কপি-পেস্ট করে প্রচার করে।

৫০ বছরের গোপনীয়তার নিয়ম

কোন বছরে নোবেল মনোনীতদের তালিকা নোবেল কমিটি কোনভাবেই প্রকাশ করে না। এমনকি যাদের মনোনীত করা হয়েছে তাদের কাছেও না। মনোনয়নের অন্তত ৫০ বছর পর এই তালিকাটি তারা প্রকাশ করে থাকে।[1] যা তাদের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। এই তালিকাটি এই সময়ের পূর্বে তখনই পাওয়া সম্ভব যদি কোন মনোনয়নকারী নিজে তার মনোনীত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করে থাকে। এমন গোপনীয় তালিকা ফাঁস হলে তা বিশ্বের সব গণমাধ্যমের শীর্ষ সংবাদ হতো। কিন্তু তা না হয় এটি হয়েছে শুধুমাত্র ‘বাংলা ইনসাইডার’ সহ কিছু বাংলাদেশি বেনামি নিউজ পোর্টালের শিরোনাম মাত্র।

মনোয়নের প্রক্রিয়া

Selection of Nobel Laureates. Source: nobelprize.org

যে কোন বছরের ফেব্রুয়ারি ১ তারিখের মধ্যে সেই বছরের নোবেল প্রাইজের জন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেওয়া যায়। মার্চের মধ্যে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয়, যা আগস্ট মাসের মধ্যে রিভিউ করা হয়। এবং পরিশেষে অক্টোবর মাসে সর্বাধিক ভোটের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল বিজয়ী নির্ধারণ করা হয়।  এই বছর, ২০১৭ সালে, মোট ৩১৮ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।[2] রোহিঙ্গা বিপর্যয়ের জন্য শেখ হাসিনাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এমন দাবী করা হলেও, আলোচ্য ঘটনাটি ঘটেছে আগস্ট মাসের শেষের দিকে। অর্থাৎ, মনোনয়ন গ্রহণের শেষ তারিখের প্রায় ৯ মাস পর। তাই রোহিঙ্গা বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনার ভূমিকার জন্য নোবেল প্রাইজের মনোনয়ন প্রদানের জন্য অন্তত আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে এবং সেটি প্রদানের ক্ষমতা রাখে সুনির্দিষ্ট ৮ ধরণের ব্যক্তিবর্গ।[1]

পাদটীকা

মন্তব্য

আমাদের ফেসবুকগ্রুপে আলোচনায় যুক্ত হোন।: www.facebook.com/groups/jaachai

প্রচারিত মাধ্যম

কোন মিডিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি? রিপোর্ট করুন