অনুসন্ধান

মূল উৎপত্তি

‘দি টপটেনস’ নামক একটি জরিপভিত্তিক ওয়েবসাইটে জনৈক ব্যবহারকারী বিশ্বের কিছু ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করে একটি অনলাইন জরিপ শুরু করে। জরিপটির শিরোনাম দেওয়া হয় “Top 10 Worst Dictators In History” (বাংলা: ইতিহাসের প্রথম ১০ নিকৃষ্ট স্বৈরশাসক)। প্রায় ৮ বছর আগে তৈরি করা এই জরিপে, সময় সময় বিভিন্ন ব্যবহারকারী নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করার ফলে এর তালিকায় যোগ হয় মোট ২১৭ জন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম। যেখানে বর্তমানে প্রথম ১০ জনের তালিকায় বাংলাদেশের শেখা হাসিনা বর্তমানে শীর্ষে। তার পরে যথাক্রমে রয়েছে, এডলফ হিটলার (জার্মানি), জোসেফ স্ট্যালিন (ইউএসএসআর), মাও জ্যাডং (চীন), কিম জং ইল (উত্তর কোরিয়া) প্রমুখ।

এই লেখাটি লেখা পর্যন্ত এই জরিপের মোট ভোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার এবং শেখা হাসিনাকে ভোট দেওয়া হয়েছে প্রায় ২ হাজারটি (১৯%)। বর্তমানে সাইটটি বাংলাদেশ থেকে একসেস করা যাচ্ছে না।

বাংলামেইল৭১ ও মনিটর নিউজ নামক দুইটি সংবাদে এই খবরটি হুবহু নকল করে প্রকাশ করা হলে এই বিভ্রান্তিকর সংবাদ নিমিষেই ভাইরাল হয়ে যায়।

কিছু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত অনলাইন মিডিয়া সম্প্রতি এই তালিকা দেখিয়ে শিরোনাম করে, ‘এবার নিকৃষ্ট স্বৈরশাসকের তালিকায় প্রথম হলেন শেখ হাসিনা!‘ যার বিবরণে বলা হয়―

এবার বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ট একনায়ক তথা স্বৈরাশাসকের তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জার্মানির নিকৃষ্ঠ স্বৈরশাসক এডলফ হিটলারকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান অর্জন করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও জনপ্রিয় জরিপভিত্তিক ওয়বসাইট ‘দি টপটেনস’ এ একটি দীর্ঘমেয়াদী জরিপের মাধ্যমে সেরা স্বৈরাশাসক নির্বাচিত হন বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

ওয়েবসাইটটি বিশ্বের ৫০ জন স্বৈরাশাসককে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি জরিপ পরিচালনা করে। সেখানে দেখা গেছে, শতকরা সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ ভোট পেয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিকৃষ্ট স্বৈরশাসকের তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। দ্বিতীয় স্থানে আছেন জার্মানির নিকৃষ্ট স্বৈরশাসক এডলফ হিটলার। তিনি পেয়েছেন ১৩ শতাংশ ভোট। ৯ শতাংশ ভোট পেয়ে রয়েছেন তৃতীয় স্থানে রয়েছেন তৎকালিন সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বৈরশাসক জোসেফ স্টালিন।

এদিকে ৫০ জন নিকৃষ্ট স্বৈরশাসকের তালিকায় কেবল বাংলাদেশেরই ৩ জন স্বৈরশাসকের নাম রয়েছে। প্রথম স্থান অর্জনকারী শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রয়েছেন তালিকার ২৩তম অবস্থানে। অন্যদিকে তালিকার শেষদিকে রয়েছে স্বৈরশাসক হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের নাম। তার অবস্থান ৪৬তম।

thetoptens.com কি?

‘দি টপটেনস’ এমন কোন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওয়েবসাইট নয়, যারা বিভিন্ন সময় গবেষণা উদ্দেশে এরকম জরিপ করে থাকে। এটি মূলত একটি সামাজিক যোগাযোগ সাইট যেখানে যে কেউ তার পছন্দ মত বিষয় নিয়ে জরিপ শুরু করতে পারে এবং অনুরূপ জরিপে ভোট দিতে পারে। এমনকি এই জরিপে অংশগ্রহণের জন্য কোন ব্যক্তিকে এই ওয়েবসাইটে একাউন্টও খুলতে হয় না। যেকেউ নির্দিষ্ট সময় পরপর এই ওয়েবসাইটে গিয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারে।

এই জরিপের পেছনের ঘটনা

নির্দিষ্ট এই জরিপটি প্রায় ৮ বছর আগে শুরু করে OzzyVanHalen নামধারী জনৈক ইউজার। ক্রমে এখানে সময় সময় অনেক নতুন নাম যুক্ত করে এবং ভোট দেয়। বর্তমানে ২য় স্থানে অবস্থানকারী এডলফ হিটলার ভোট ১৩% পেয়েছেন অথচ কমেন্ট পেয়েছেন ২৫৯ টি। অপরদিকে শেখ হাসিনা ১৯% ভোট পেয়ে কমেন্ট পেয়েছেন প্রায় ২২১৪টি।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এই জরিপটি বাংলাদেশে প্রথম ফলাও করে প্রচার করা হয়―

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে এই একই জরিপ ব্যবহার করে ফেসবুকে এই বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়।

অথচ সেই বছরেই জুনে এই জরিপে শেখ হাসিনার অবস্থান ছিলো ১৯তম (মোট ব্যক্তির উল্লেখ ছিলো ৭৭ জন), কমেন্ট ছিলো ৩টি, জরিপে সর্বমোট ভোট ছিলো ১০০০টি। ডিসেম্বর ২৫ তারিখ পর্যন্ত শেখ হাসিনার অবস্থা্ন এসে দাঁড়ায় ২৮তম তে (কমেন্ট ছিলো ৩টি, জরিপের সর্বোমোট ভোট ২০০০টি)।[1]

২০১৩ সালের ডিসেম্বর ২৫ তারিখের ওয়েব পেইজের স্ক্রিনশট।

অথচ মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে ডিসেম্বর ৩১ তারিখে তার অবস্থান চলে আসে ১ম স্থানে (জরিপের সর্বমোট ভোট ৯০০০টি, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে কমেন্ট আসে হাজারখানেক)।

এথেকে এটি স্পষ্ট যে, এই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কোন একটি গোষ্ঠী, এই ওয়েবসাইটে ভুয়া ভোট দেওয়ার পদ্ধতি বের করে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শেখ হাসিনাকে অজস্র ভুয়া ভোট প্রদান করে এক নম্বর স্থানে নিয়ে আসে।

তাই এই জরিপ আন্তর্জাতিক গণমত তো দূরের কথা, জাতীয় গণমতকেও প্রতিনিধিত্ব করে না। এই জরিপ ও জরিপ পদ্ধতির দুর্বলতা ব্যবহার করে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে মাত্র।

প্রথম প্রকাশ:
সর্বশেষ হালনাগাদ:

পাদটীকা

তথ্যসূত্র

  1. "Top 10 Worst Dictators In History". thetoptens.com. (ডিসেম্বর ২৫, ২০১৩).

মন্তব্য

আমাদের ফেসবুকগ্রুপে আলোচনায় যুক্ত হোন।: www.facebook.com/groups/jaachai